rocket_launch বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি auto_stories প্রচ্ছদ বিশেষ নিবন্ধ

গভীর মহাবিশ্বের সন্ধানে: জেমস ওয়েব ও দূর গ্যালাক্সির রহস্য

কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের আদিম নক্ষত্রমণ্ডল ও কৃষ্ণগহ্বরের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য উন্মোচনে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক অভিযান।

edit_note
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
ইস্কুল সম্পাদকীয় বিভাগমে ২০২৪ • সংখ্যা ৮৪৮ মিনিট পাঠ
shareশেয়ার
NIRCam • Infrared Deep Field
photo_cameraজেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ দ্বারা ধারণকৃত মহাজাগতিক নীহারিকা ও দূরবর্তী তারকাপুঞ্জের দৃশ্য। (প্রতীকী সম্পাদকীয় চিত্রণ)
lock_open_right

ইস্কুল উন্মুক্ত পাঠাগার • বাংলাদেশে প্রকাশিত সকল ওয়েব নিবন্ধ কিশোর ও তরুণদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ার জন্য উন্মুক্ত।

মহাবিশ্ব এক অনন্ত রহস্যের আধার। রাতের পরিষ্কার আকাশে খালি চোখে যখন আমরা কোনো জ্বলজ্বলে তারার দিকে তাকাই, আমরা কিন্তু বর্তমানের নক্ষত্রটিকে দেখি না—আমরা দেখি সেই আলোককণা, যা কোটি বা লাখ বছর আগে নক্ষত্রটি থেকে রওনা দিয়েছিল। এই আলো মহাকাশের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়, ততদিনে হয়তো সেই নক্ষত্রটি নিজেই ধসে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়েছে।

মহাবিশ্বের এই আদিমতম রূপ এবং প্রথম গ্যালাক্সিগুলোর জন্ম কীভাবে হয়েছিল, তা উদঘাটন করাই ছিল বিশ্বখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের যুগান্তকারী লক্ষ্য। হাবল স্পেস টেলিস্কোপ তিন দশক ধরে দৃশ্যমান আলোর সাহায্যে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিল। কিন্তু মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হওয়ার ফলে সেই প্রাচীন আলোকতরঙ্গ লাল প্রান্তের সীমা পেরিয়ে অদৃশ্য ইনফ্রারেড বা অবলোহিত আলোতে রূপান্তরিত হয়েছে। আর ঠিক সেখানেই আবির্ভূত হয়েছে এক অনন্য বিস্ময়—জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST)।

মহাকর্ষীয় লেন্সিং ও আদিমতম নক্ষত্রমণ্ডলের সন্ধান

আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাশূন্যে অত্যন্ত ভারী কোনো গ্যালাক্সি ক্লাস্টার তার চারপাশের স্থান-কালকে এমনভাবে বাঁকিয়ে দেয়, যা পেছনের দূরবর্তী ক্ষীণ বস্তুর আলোকে প্রবর্ধিত ও বিকৃত করে তোলে। এই মহাজাগতিক ঘটনাকে বলা হয় 'মহাকর্ষীয় লেন্সিং'।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের অন্যতম বড় সাফল্য হলো প্রকৃতির নিজস্ব এই অতিকায় দূরবীন বা লেন্সিং প্রভাবকে ব্যবহার করে এমন কিছু গ্যালাক্সির সংকেত সংগ্রহ করা, যেগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল বিগ ব্যাং-এর মাত্র ৩০ থেকে ৪০ কোটি বছর পরে। মহাজাগতিক ধূলিকণার ঘন পর্দা ভেদ করে অবলোহিত তরঙ্গের সাহায্যে জেমস ওয়েব স্পষ্ট করে তুলেছে সেইসব গ্যালাক্সির সর্পিল হাত ও নবজাতক নক্ষত্রের জন্মচুল্লি।

lightbulb

ইনসাইট: জেমস ওয়েবের বিশেষত্ব কী?

hexagon

স্বর্ণলেপিত বেরিলিয়াম দর্পণ: ৬.৫ মিটার চওড়া প্রাথমিক আয়নাটি ১৮টি ষড়ভুজ খণ্ডে বিভক্ত এবং প্রতিটি খণ্ডে রয়েছে বিশুদ্ধ সোনার পাতলা আস্তরণ, যা অবলোহিত রশ্মি প্রতিফলনে ৯৮% কার্যকর।

satellite_alt

ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ২ (L2): পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে সূর্য ও পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ভারসাম্যে অবস্থান করে এই টেলিস্কোপ সর্বদা সৌরঝলক থেকে সুরক্ষিত থাকে।

ac_unit

চরম শীতল তাপমাত্রা: টেনিস কোর্টের সমান ৫ স্তরবিশিষ্ট সানশিল্ড টেলিস্কোপের যন্ত্রাংশকে মাইনাস ২২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠাণ্ডা রাখে, যাতে নিজস্ব উত্তাপ সংবেদনশীলতায় বাধা না দেয়।

blur_on

রেডশিফ্ট বিশ্লেষণ: সুদূর অতীতের আলোকতরঙ্গ মহাবিশ্বের প্রসারণে দীর্ঘতর হতে হতে ইনফ্রারেড অঞ্চলে পৌঁছে যায়, যা ওয়েবের সংবেদনশীল সেন্সরে নিখুঁত বর্ণালীতে ধরা পড়ে।

“আমরা মহাবিশ্বের যত দূরে তাকাই, আসলে তত পেছনের সময়কে দেখি। মহাবিশ্ব তার শৈশবের ছবি লুকিয়ে রেখেছিল ঘন ইনফ্রারেড আলোর আবরণে—আর আমরা অবশেষে সেই চাদর সরাতে পেরেছি।”
— আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ পর্যবেক্ষণ সমীক্ষা

কৃষ্ণগহ্বর ও গ্যালাক্সির জন্মলগ্নের সংযোগ

জেমস ওয়েবের সাম্প্রতিকতম ফলাফল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের প্রচলিত কিছু ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, বিগ ব্যাং-এর পর প্রাথমিক গ্যালাক্সিগুলো ছিল অত্যন্ত ছোট এবং বিশৃঙ্খল। কিন্তু ওয়েবের চোখ দিয়ে দেখা যাচ্ছে, মহাবিশ্বের বয়স যখন মাত্র ৫০ কোটি বছর, তখনই সেখানে বিশাল ভরযুক্ত পূর্ণাঙ্গ গ্যালাক্সি এবং তাদের কেন্দ্রে অতিভারী সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল বা দানবীয় কৃষ্ণগহ্বর বিদ্যমান ছিল।

ইনফ্রারেড রেডশিফ্ট স্পেকট্রাম পর্যবেক্ষণ JWST NIRSpec ডাটা
দৃশ্যমান আলোকবর্ণালী (৪০০ ন্যানোমিটার) অবলোহিত রেডশিফ্ট জোন (১-২৮ মাইক্রন) দূরবর্তী গ্যালাক্সি হাইড্রোজেন নিঃসরণ (z = ১১.১)

চিত্র: দূরবর্তী মহাবিশ্বের গ্যালাক্সির হাইড্রোজেন লাইম্যান-ব্রেক নিঃসরণ কীভাবে ওয়েবের ইনফ্রারেড স্পেকট্রোমিটারে শনাক্ত হয়।

এই আবিষ্কারের অর্থ হলো, হয়তো কৃষ্ণগহ্বরগুলো গ্যালাক্সি তৈরি হওয়ার পরে নয়, বরং গ্যালাক্সি সৃষ্টির বীজ হিসেবেই কাজ করেছিল। এমন অভূতপূর্ব প্রশ্ন আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করে দিয়েছে যা আগামী দশকজুড়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের ভাবাবে।

নতুন প্রজন্মের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনুপ্রেরণা

মহাকাশ শুধু উন্নত দেশের ধনকুবের বা নাসার বিজ্ঞানীদের একক এলাকা নয়। বাংলাদেশের কিশোর-তরুণরা আজ জ্যোতির্বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, রোবোটিক্স ও কোডিং-এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে। জেমস ওয়েবের সংগৃহীত প্রায় সকল বৈজ্ঞানিক তথ্য ও চিত্রাবলী বিশ্বের যে কারো জন্য উন্মুক্ত ওপেন-সোর্স ডাটাবেজে রয়েছে।

তুমি যদি পাইথন কোডিং, অঙ্ক কিংবা মৌলিক পদার্থবিদ্যায় আগ্রহী হও, তুমিও নিজের কম্পিউটারেই এই ডাটা বিশ্লেষণ করে নতুন গ্রহ বা নক্ষত্রপুঞ্জ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারো। ইস্কুল বিশ্বাস করে, আমাদের তরুণদের মনের ভেতর যে কৌতূহলের স্পার্ক রয়েছে, একদিন তারাই বাংলার মাটি থেকে মহাবিশ্বের পরবর্তী অমীমাংসিত সমীকরণ সমাধান করবে।

verified

সম্পাদকীয় দ্রষ্টব্য

এটি ইস্কুল বিজ্ঞান ও গবেষণা বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংকলিত নিবন্ধ। প্রকাশের মূল তথ্য CMS প্যানেল থেকে হালনাগাদযোগ্য।

সম্পর্কিত লেখা

আরও যা পড়তে পারো

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
ইস্কুল প্রতিনিধি • ৬ মিনিট পাঠ

রোবোটিক্স অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের কিশোরদের বিজয়রথ

বিশ্বসেরা দলগুলোকে পেছনে ফেলে কীভাবে স্বয়ংক্রিয় রোবট তৈরি করে আন্তর্জাতিক মেডেল ছিনিয়ে আনল চার তরুণ স্বপ্নবাজ।

পরিবেশ ও অভিযান
আহমেদ সাফওয়ান • ৫ মিনিট পাঠ

আমাজনের গভীর অরণ্যে নতুন প্রজাতির সন্ধানে

পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজন রেইনফরেস্টে তরুণ অভিযাত্রী দলের তিন সপ্তাহের রোমাঞ্চকর অভিযান ও অজানা প্রাণীর গল্প।

কমিকস ও শিল্প
আর্ট টিম • ৭ মিনিট পাঠ

চিত্রনাট্য ও কমিকস তৈরির হাতেখড়ি: ইস্কুল কর্মশালা

নিজের কল্পনার চরিত্রকে রঙ ও সংলাপের ফ্রেমে জীবন্ত করে তোলার সহজ গাইডলাইন—স্কেচ থেকে ডিজিটাল ফাইনাল আর্ট।